সোমবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২০
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চীনের প্রভাব আরো বাড়বে

করোনাভাইরাস ইস্যুতে চীন থেকে সরে যাওয়া বিদেশি বিনিয়োগের কিছু অংশ যাতে বাংলাদেশে আসে, সে লক্ষ্যে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, করোনা পরবর্তী সময়ে অর্থনীতির গতি-প্রকৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসছে। এ সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের, বিশেষ করে চীন থেকে বড় ধরনের বিনিয়োগ পাওয়ার আশায় রয়েছে সরকার। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এসব কারণে আগামীতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চীনের প্রভাব আরও বাড়বে।

এদিকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ নেওয়াসহ বিভিন্ন নীতিমালা সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সর্বশেষ বাংলাদেশ ব্যাংক বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বৈদেশিক মুদ্রার (এফসি) অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ করে দিয়েছে। ফলে এখন থেকে বাংলাদেশের কোনও প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করা কোনও বিদেশি বিনিয়োগকারী তার লভ্যাংশের অর্থ এফসি অ্যাকাউন্টে রাখতে পারবেন। যেকোনও সময় অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ নিজ দেশে বা অন্য দেশে নিয়ে যেতে পারবেন। আবার বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলে লভ্যাংশের অর্থ বাংলাদেশে বিনিয়োগও করতে পারবে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে নানা উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই শিথিলতা এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা জারি করে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

যদিও এর আগে একই বিষয়ে নানা ধরনের বিধিনিষেধ ছিল। মনে করা হচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের ফলে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। বিশেষ করে চীনা বিনিয়োগ বাড়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে।
এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান মনসুর বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চীনে দাপট আরও বাড়বে। কারণ, সারা পৃথিবীর মধ্যে সম্পদশালী দেশ এখন চীন। এছাড়া, সারা পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগও চীনেরই। ফলে করোনা ইস্যুতে চীন থেকে কেউ তাদের বিনিয়োগ সরিয়ে নিলেও চীনের অর্থনীতিতে এর কোনও প্রভাব পড়বে না। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাতে বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ বাড়বে।’

তিনি উল্লেখ করেন, অন্যান্য নতুন দেশ শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার দেখে এই দেশে বিনিয়োগ বাড়াবে না। কিন্তু চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলে লভ্যাংশের অর্থ বাংলাদেশে বিনিয়োগও করতে পারবে। তিনি মনে করেন, বিনিয়োগ বাড়াতে হলে অনেক কিছু সহজ করতে হবে। যেমন, বিদেশি বিনিয়োগের জন্য এখানে বিনামূল্যে জমি দেওয়া, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম কমাতে হবে। রাস্তাঘাট ভালো করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ‘দেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে তিনটি দেশের দিকে নজর দিতে হবে। এই দেশ তিনটি হলো— প্রথমত চীন, এছাড়া জাপান ও কোরিয়া।’

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চীনের প্রভাব এখন সবচেয়ে বেশি। ২০১৬ সালের পর থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে দেশটি। ফলে এই মুহূর্তে চীনই বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বিনিয়োগকারী রাষ্ট্র।

এখন পর্যন্ত চীন থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ এসেছে (স্টক বিনিয়োগ) ২ হাজার ৯০৭ মিলিয়ন ডলার। শুধু ২০১৯ সালে চীন থেকে নতুন বিনিয়োগ এসেছে এক হাজার ৪০৮ মিলিয়ন ডলার।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ সালে বাংলাদেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ ছিল ৩৬০ কোটি ডলার। এরমধ্যে চীনই করেছে বেশি। গত বছর চীনের পর নেদারল্যান্ড ছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিনিয়োগকারী রাষ্ট্র। দেশটি এখানে বিনিয়োগ করেছে ৬৯ কোটি ২০ লাখ ডলার। ৩৭ কোটি ১০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করে তৃতীয় স্থানে রয়েছে ব্রিটেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্থান চতুর্থ। যদিও একসময় যুক্তরাষ্ট্রই ছিল শীর্ষে। ২০১৮ সালে ১৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করে চতুর্থ স্থানে ছিল যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৮০ সালের পর থেকে বাংলাদেশে সরাসরি বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ১৯৯৫ সালে মোবাইল টেলিযোগাযোগ খাতে বৈদেশিক বিনিয়োগে অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ। এরপরই নরওয়ের টেলিনর ও মিসরের ওরাশকমের মতো টেলিকম জায়ান্ট বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

জানা গেছে, মহামারি করোনার সংক্রমণ শুরুর পর চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে চীনে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ১০ শতাংশ কমেছে। চীন থেকে সরতে চাওয়া বিদেশিদের আকর্ষণের জন্য ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশ নানা রকম চেষ্টা চালাচ্ছে। বাংলাদেশও সেটা করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ পলিসি ডিপার্টমেন্টের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ খুরশিদ ওয়াহাব বলেন, ‘চীন থেকে সরে যাওয়া বিদেশি বিনিয়োগ বাংলাদেশে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘গত ২৬ জুন অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে পাঠানো এক চিঠিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যাতে অনায়াসে তাদের বিনিয়োগের অর্থ-লভ্যাংশ নিজ দেশ বা অন্যত্র নিয়ে যেতে পারেন, সে ব্যাপারে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে অনুরোধ করা হয়েছিল।’

সেই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতেই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের এফসি অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত হবে বলে মনে করেন মোহাম্মদ খুরশিদ ওয়াহাব। তিনি উল্লেখ করেন, এতদিন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তাদের লভ্যাংশের অর্থ তাদের নিজ দেশে নিয়ে যেতে পারতেন। এখন এফসি অ্যাকাউন্ট খুলে ওই অ্যাকাউন্টে লভ্যাংশের অর্থ রাখতে পারবেন। আবার যখন খুশি বিনিয়োগকারীরা তার লভ্যাংশের অর্থ বাংলাদেশে যেকোনও প্রতিষ্ঠানে পুনঃবিনিয়োগ করতে পারবেন।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য দেশে ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে ‍তুলছে সরকার। এছাড়া বিদ্যমান ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্ট যুগোপযোগী করার জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি একটি খসড়া তৈরি করেছে।

বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে এই আইনে আর কী কী পরিবর্তন আনা দরকার, সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করে দ্রুততম সময়ে আইনটি পাস করার ওপর জোর দেওয়া হয় চিঠিতে। বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, তা কাজে লাগাতে ব্যাংকিং কার্যক্রম পর্যালোচনা করে বিদ্যমান আইনগত, নীতিগত এবং পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করে তা দূর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধও করে অর্থ মন্ত্রণালয়।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের ১১ মাসে (জুলাই-মে) বিভিন্ন খাতে সব মিলিয়ে ৩৭২ কোটি ৮০ লাখ ডলার এফডিআই বা সরাসরি বিনিয়োগ এসেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১৪ শতাংশ কম।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে চীন থেকে আমদানি হয়েছে ১৩ হাজার ৬৩৮ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। একই সময়ে সর্বোচ্চ দ্বিতীয় আমদানিকারক দেশ ভারত থেকে ৭ হাজার ৬৪৭ মিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। অর্থাৎ ভারতের চেয়ে চীন থেকে প্রায় দ্বিগুণ পণ্য আমদানি করেছে। এছাড়া চীনে পণ্য রফতানি হয়েছে ৭৪৭ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলারের। এদিকে বাংলাদেশের রফতানি বাড়াতে সম্প্রতি চীন বাংলাদেশকে বাণিজ্যিক সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে চীনের বাজারে আরও ৫ হাজার ১৬১ পণ্যের ৯৭ শতাংশ শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়েছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে বাংলাদেশ এ সুবিধা পাচ্ছে। আর এটি বলবৎ থাকবে ২০২৪ সাল পর্যন্ত। অবশ্য বাংলাদেশ ইতোমধ্যে চীন থেকে এপিটির আওতায় ৩ হাজার ৯৫টি পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়ে আসছিল। ওই সুবিধার বাইরে ৯৭ শতাংশ শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হলো। এতে শুল্কমুক্ত সুবিধার আওতায় চীনের বাজারে বাংলাদেশের ৮ হাজার ২৫৬টি পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধার আওতায় এসেছে।

সরকারি তথ্য বলছে, এত কিছুর পরও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে ১২ হাজার ৮৯১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

সোনার দামে রেকর্ড

লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে সোনার দাম। বিশ্বজুড়ে দ্বিতীয় দফায় করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। বুধবার (৮ জুলাই) বিশ্ববাজারে সোনার দাম বেড়ে প্রতি আউন্স এক হাজার ৮০০ ডলার ছাড়িয়েছে। যা গত ৯ বছরের রেকর্ড।

এর আগে ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে এমন দাম বেড়েছিল। তবে এবার সোনার দাম বাড়ার পেছনে নিরাপদ বিনিয়োগকে কারণ মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বুধবার যুক্তরাজ্যের বাজারে সোনার দাম বেড়ে প্রতি আউন্স হয় এক হাজার ৮০০ দশমিক ৮৬ ডলার, যা গত সাড়ে আট বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ দাম। এর আগে ২০১১ সালে সোনার দাম উঠেছিল ৯২১ দশমিক ১৮ ডলার।

গত বছরের শেষদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম ছিল ১৪৫৪ ডলার। এরপর করোনাভাইরাস প্রকোপের মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে ১৬৬০ ডলারে ওঠে। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার এই দাম বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বাজারেও দাম বাড়ানো হয়।

এছাড়া, গত ফেব্রুয়ারিতে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম রেকর্ড ৬১ হাজার ৫২৭ টাকায় ওঠে। এছাড়া ২১ ক্যারেট ৫৯ হাজার ১৯৪ এবং ১৮ ক্যারেটের ৫৪ হাজার ১৭৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়। সনাতন পদ্ধতিতে সোনার দাম নির্ধারণ হয় ৪১ হাজার ৪০৭ টাকা।

তবে মার্চে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দামে বড় পতন হয়। এক ধাক্কায় দাম কমে প্রতি আউন্স ১৪৬৯ ডলারে নেমে আসে। এ পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বাজারেও সোনার দাম কমানো হয়।

করোনার অর্থনৈতিক বিপর্যয় ভোগাবে কয়েক প্রজন্মকে

কোভিড-১৯ মহামারী তাণ্ডবের ভয়াবহ পরিস্থিতি আমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে বালজের যুদ্ধে ৮৪তম পদাতিক সৈনিক হিসেবে যুবক বয়সে আমার অংশগ্রহণ। তখন ১৯৯৪ সালের শেষভাগ। বিশ্বে সে সময় অপরিণত বিপদের ছড়াছড়ি, যার লক্ষ্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি নয়, বরং আঘাত হানছে এলোপাতাড়ি এবং সবকিছু তছনছ করে দিচ্ছে।

তবে তখনকার এবং এখনকার সময়ের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পার্থক্য রয়েছে। যখন করোনাভাইরাস মহামারী শেষ হবে তখন বহু দেশের সিংহভাগ প্রতিষ্ঠান মুখ থুবড়ে পড়বে। বাস্তবতা হল-করোনার তাণ্ডবের পর বিশ্ব আর আগের রূপে থাকবে না। পুরো বিশ্ব-শৃঙ্খল পাল্টে দেবে এ ভাইরাস। এখন অতীত নিয়ে বিতর্ক করলে আগামীতে আমাদের কী করার প্রয়োজন রয়েছে, তা থেকে পিছিয়ে যাব।

নজিরবিহীন মাত্রা ও ক্ষিপ্রতায় সারা বিশ্বে আঘাত হেনেছে করোনাভাইরাস। এ ভাইরাসে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি পাঁচ দিনে দ্বিগুণ হারে সংক্রমিত হচ্ছে। এ নিবন্ধ লেখা পর্যন্ত (৩ এপ্রিল) করোনার কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি। করোনা সংক্রমণের সুনামি প্রতিরোধে মেডিকেল সরঞ্জাম খুবই সীমিত। নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলো (আইসিইউ) কানায় কানায় পূর্ণ। চিকিৎসকরা হতবিহ্বল। সংক্রমণের মাত্রা নিরূপণে পরীক্ষার হার খুবই সীমিত। একটি সফল প্রতিষেধক তৈরিতে ১২ থেকে ১৮ মাস সময় লাগতে পারে। করোনা মহামারীর তাৎক্ষণিক বিপর্যয় এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন দারুণ কাজ করেছে। একমাত্র পরীক্ষাই পারে এ ভাইরাস সংক্রমণকে আটকাতে। এ সংকট পুরোপুরি কাটাতে তাদের আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এর জন্য শুধু আমেরিকানদেরই নয়, গোটা বিশ্বের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করতে হবে তাদের।

এ সংকটকে জাতীয়তার ভিত্তিতেই মোকাবেলা করতে হবে বিশ্বনেতাদের। ভাইরাসের সমাজ ভেঙে দেয়া প্রভাব কখনও কোনো সীমান্তকে স্বীকৃতি দেয় না, কোনো সীমান্ত মানে না। যদিও মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর করোনাভাইরাসের হামলা সাময়িক, কিন্তু এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় কয়েক প্রজন্ম ধরেই ভোগ করতে হবে। এককভাবে কোনো দেশ, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও তাদের জাতীয় প্রচেষ্টার মাধ্যমে এ ভাইরাসকে মোকাবেলা করতে পারবে না। এই মুহূর্তে সব দেশের সমন্বিত পরিকল্পনা ও তার যথাযথ বাস্তবায়নই এ সংকট মোকাবেলায় একমাত্র সহায়ক হতে পারে। যদি আমরা করোনা সংকট মোকাবেলায় ব্যর্থ হই, প্রত্যেকেই এর ক্ষতির মুখে পড়ব।

বৈশ্বিক এই সংকট কাটাতে যুক্তরাষ্ট্রকেই নেতৃত্বের আসনে থেকে তিনটি মার্শাল পরিকল্পনা নিতে হবে। প্রথমত, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থামাতে হবে। এর আগে চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিজয় যেমন পোলিও ভ্যাকসিন আবিষ্কার, গুটিবসন্ত নির্মূল অথবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে মেডিকেল চিকিৎসার কৌশল উদ্ভাবন আমাদের বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ দেখিয়েছে। এই বিজয় থেকে করোনা সংক্রমণ রোধে নতুন কৌশল ও প্রযুক্তি আবিষ্কার করতে হবে। এরপর সেগুলো বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, সব শহর, অঙ্গরাজ্য ও অঞ্চলকে, তাদের জনগণ যেন পণ্য মজুদ করতে না পারেন, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। সবশেষ, করোনাভাইরাসের কারণে তৈরি বৈশ্বিক অর্থনীতির ক্ষত সারিয়ে তুলতে হবে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের পক্ষেও একা সম্ভব নয়, বৈশ্বিক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকট থেকে বিশ্বনেতাদের শিক্ষা নিতে হবে।

সবজি ও ফল চাষের বারো মাসের পঞ্জিকা

সবজি ও ফল চাষের বারো মাসের পঞ্জিকা- -

আমাদের দেশে সাধারণত ঋতু বা মৌসুম ছ’টি। আর কৃষির মৌসুম তিনটি- খরিফ-১, খরিফ-২ ও রবি। উৎপাদনের ওপর ভিত্তি করে যদিও কৃষি মৌসুমকে তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে, কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থান, আবহাওয়া, জলবায়ু এবং আমাদের প্রয়োজনের তাগিদে প্রতি মাসের প্রতিটি দিনই কিছু না কিছু কৃষি কাজ করতে হয়। চাষিরা নিজস্ব চিন্তা ধারা, চাহিদা ও আর্থিক দিক বিবেচনা করে নিজের মত প্রতিদিনের কাজ গুলোকে সাজিয়ে নিবেন ও বাস্তবে রূপ দেবেন।

বৈশাখ (মধ্য এপ্রিল-মধ্য মে):
লালশাক, গিমাকলমি, ডাঁটা, পাতাপেঁয়াজ, পাটশাক, বেগুন, মরিচ, আদা, হলুদ, ঢেঁড়স বীজ বপন এর উত্তম সময় . সঙ্গে গ্রীষ্মকালীন
টমেটো চারা রোপণ করতে হবে । মিষ্টিকুমড়া, করলা, ধুন্দুল, ঝিঙা, চিচিংগা, চালকুমড়া, শসার মাচা তৈরি, চারা উৎপাদন করতে হবে . কুমড়া জাতীয় সবজির পোকা মাকড় দমন এর ব্যবস্থা ও সেচ প্রদান করতে হবে । খরিফ-১ মৌসুমের সবজির বীজ বপন, চারা রোপণ করতে হবে . ডাঁটা, পুঁইশাক, লালশাক, বরবটি ফসল সংগ্রহ করতে হবে । খরিফ-২ সবজির বেড প্রস্তুত ও চারা তৈরি করতে হবে। কচি সজিনা, তরমুজ, বাঙ্গি সংগ্রহ করতে হবে । ফল চাষের স্থান নির্বাচন, উন্নতজাতের ফলের চারা/কলম সংগ্রহ, পুরানো ফল গাছে সুষম সার প্রয়োগ ও ফলন্ত গাছে সেচ প্রদান করতে হবে।

জ্যৈষ্ঠ (মধ্য মে-মধ্য জুন):
আগে বীজতলায় বপনকৃত খরিফ-২ এর সবজির চারা রোপণ, সেচ ও সার প্রয়োগ, বিভিন্ন পরিচর্যা করতে হবে . সজিনা সংগ্রহ করতে হবে এবং গ্রীষ্মকালীন টম্যাটোর চারা রোপণ ও পরিচর্যা করতে হবে। ঝিঙা, চিচিংগা, ধুন্দুল, পটল, কাঁকরোল সংগ্রহ ও পোকামাকড় দমন এর ব্যবস্থা নিতে হবে। নাবী কুমড়া জাতীয় ফসলের মাচা তৈরি, সেচ ও সার প্রয়োগ করতে হবে . ফলের চারা রোপণের গর্ত প্রস্তুত ও বয়স্ক ফল গাছে সুষম সার প্রয়োগ,ফলন্ত গাছের ফল সংগ্রহ, বাজারজাতকরণ এর ব্যবস্থা করতে হবে ।

আষাঢ় (মধ্য জুন-মধ্য জুলাই):
গ্রীষ্মকালীন বেগুন, টমেটো, কাঁচা মরিচের পরিচর্যা, শিমের বীজ বপন, কুমড়া জাতীয় সবজির পোকামাকড়, রোগবালাই দমন করতে হবে। আগে লাগানো বেগুন, টমেটো ও ঢেঁড়সের বাগান থেকে ফসল সংগ্রহ করতে হবে। খরিফ-২ সবজির চারা রোপণ ও পরিচর্যা, সেচ, সার প্রয়োগ করতে হবে। ফলসহ ওষুধি গাছের চারা/কলম রোপণ, খুঁটি দিয়ে চারা বেঁধে দেয়া, খাঁচা/বেড়া দেয়া ও ফল গাছে সুষম সার প্রয়োগ করতে হবে .

শ্রাবণ (মধ্য জুলাই-মধ্য আগস্ট):
আগাম রবি সবজি যেমন বাঁধাকপি, ফুলকপি, লাউ, টম্যাটো, বেগুন এর বীজতলা তৈরি, বীজ বপন শুরু করা যেতে পারে। খরিফ-২ এর সবজি উঠানো ও পোকামাকড় দমন করতে হবে। শিমের বীজ বপন, লালশাক ও পালংশাকের বীজ বপন করতে হবে। রোপণকৃত ফলের চারার পরিচর্যা, উন্নত চারা/কলম রোপণ, খুঁটি দেয়া, খাঁচি বা বেড়া দেয়া, ফলন্ত গাছের ফল সংগ্রহ করতে হবে।

ভাদ্র (মধ্য আগস্ট-মধ্য সেপ্টেম্বর):
অধিকাংশ খরিফ-২ সবজির সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও খরিফ-১ এর সবজি বীজ সংরক্ষণ এর ব্যবস্থা করতে হবে। আগাম রবি সবজি বাঁধাকপি, ফুলকপি, ওলকপি, সবুজ ফুলকপি, টম্যাটো, বেগুন, কুমড়া , লাউ-এর জমিতৈরি, চারা রোপণ, সার প্রয়োগ ইত্যাদি করতে হবে। মধ্যম ও নাবী রবি সবজির বীজতলা তৈরি, বীজ বপন করতে হবে । নাবী খরিফ-২ সবজি সংগ্রহ, বীজ সংরক্ষণ করতে হবে। আগে লাগানো ফলের চারার পরিচর্যা সহ ফলের উন্নত চারা/কলম লাগানো, খুঁটি দেয়া, বেড়া দিয়ে চারাগাছ সংরক্ষণ, ফল সংগ্রহের পর গাছের অঙ্গ ছাঁটাই করতে হবে।

আশ্বিন (মধ্য সেপ্টেম্বর – মধ্য অক্টোবর):
আগাম রবি সবজির চারা রোপণ, চারার যত্ন, সেচ, সার প্রয়োগ, বালাই দমন সহ নাবী রবি সবজির বীজতলাতৈরি, বীজ বপন, আগাম টম্যাটো, বাঁধাকপি, ফুলকপি, সবুজ ফুলকপি, ওলকপির আগাছা দমন করতে হবে। শিম, লাউ, বরবটির মাচাতৈরি ও পরিচর্যা করতে হবে। রসুন, পেঁয়াজের বীজ বপন, আলু লাগাতে হবে। ফল গাছের গোড়ায় মাটি দেয়া, আগাছা পরিষ্কার ও সার প্রয়োগ করতে হবে।

কার্তিক (মধ্য অক্টোবর – মধ্য নভেম্বর):
আলুর কেইল বাঁধা ও আগাম রবি সবজির পরিচর্যা ও সংগ্রহ করতে হবে। মধ্যম রবি সবজি পরিচর্যা, সার প্রয়োগ, সেচ প্রদান করতে হবে। নাবী রবি সবজির চারা উৎপাদন, জমিতৈরি/চারা লাগানোর ব্যবস্থা করতে হবে। বাঁধাকপি, ফুলকপি, ওলকপির গোড়া বাঁধা/ আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। মরিচের বীজ বপন/চারা রোপণ করতে হবে। ফল গাছের পরিচর্যা,সার প্রয়োগ না করে থাকলে সার ব্যবহার ও মালচিং করে মাটিতে রস সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে।

অগ্রহায়ণ (মধ্য নভেম্বর – মধ্য ডিসেম্বর):
মিষ্টি আলুর লতা রোপণ, পূর্বে রোপণকৃত লতার পরিচর্যা, পেঁয়াজ, রসুন ও মরিচের চারা রোপণ, আলুর জমিতে সার প্রয়োগ, সেচ প্রদান ইত্যাদি করতে হবে। অন্যান্য রবি ফসল যেমন ফুলকপি, বাঁধাকপি, টম্যাটো, বেগুন ওলকপি, শালগম-এর চারার যত্ন, সার প্রয়োগ, সেচ প্রদান, আগাছা পরিষ্কার ও সবজি সংগ্রহ করতে হবে। ফল গাছের মালচিং এবং পরিমিত সার প্রয়োগ করতে হবে।

পৌষ (মধ্য ডিসেম্বর – মধ্য জানুয়ারি):
আগাম ও মধ্যম রবি সবজির পোকামাকড় ও রোগবালাই দমন ও সবজি সংগ্রহ করতে হবে। নাবী রবি সবজির পরিচর্যা, ফল গাছের পোকামাকড় ও রোগবালাই দমন এবং অন্যান্য পরিচর্যা করতে হবে। যারা বাণিজ্যিকভাবে মৌসুমি ফুলে চাষ করতে চান তাদেরকে এ সময় ফুল গাছের বেশি করে যত্ন নিতে হবে বিশেষ করে সারের উপরি প্রয়োগ করতে হবে।

মাঘ (মধ্য জানুয়ারি – মধ্য ফেব্রুয়ারি):
আলু, পেঁয়াজ, রসুন-এর গোড়ায় মাটি তুলে দেয়া, সেচ, সার প্রয়োগ, টম্যাটোর ডাল ও ফল ছাঁটা, মধ্যম ও নাবী রবি সবজির সেচ, সার, গোড়া বাঁধা, মাচা দেয়া এবং আগাম খরিফ-১ সবজির বীজতলাতৈরি বা মাদা তৈরি বা বীজ বপন করতে হবে। বীজতলায় চারা উৎপাদনে বেশি সচেতন হতে হবে। কেননা সুস্থ-সবল রোগমুক্ত চারা রোপণ করতে পারলে পরবর্তীতে অনায়াসে ভাল ফসল/ফলন আশা করা যায়। ফল গাছের পোকামাকড়, রোগাবালাই দমন ও অন্যান্য পরিচর্যা করতে হবে।

ফাল্গুন (মধ্য ফেব্রুয়ারি – মধ্য মার্চ):
নাবী খরিফ-১ সবজির বীজতলা তৈরি, মাদাতৈরি, বীজ বপন, ঢেঁড়স, ডাঁটা লালশাক এর বীজ বপন করতে হবে। আগাম খরিফ-১ সবজির চারা উৎপাদন ও মূল জমিতৈরি, সার প্রয়োগ ও রোপণ করতে হবে। আলু, মিষ্টি আলু সংগ্রহ, রবি সবজির বীজ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বাগানের অন্যান্য ফসলের পরিচর্যা করতে হবে। আলু সংরক্ষণে বেশি যত্নবান হোন। এক্ষেত্রে জমিতে আলু গাছের বয়স ৯০ দিন হলে মাটির সমান করে সমুদয় গাছ কেটে গর্তে আবর্জনা সার তৈরি করুন। এভাবে মাটির নিচে ১০ দিন আলু রাখার পর অর্থাৎ রোপণের ১০০ দিন পর আলু তুলতে হবে। এতে চামড়া শক্ত হবে ও সংরক্ষণ ক্ষমতা বাড়বে। ফল গাছের গোড়ায় রস কম থাকলে মাঝে মধ্যে সেচ প্রদান, পোকামাকড় ও রোগবালাই দমন করা দরকার।

চৈত্র (মধ্য মার্চ – মধ্য এপ্রিল):
গ্রীষ্মকালীন বেগুন, টম্যাটো, মরিচ- এর বীজ বপন/চারা রোপণ করা দরকার। নাবী জাতের বীজতলা তৈরি ও বীজ বপন করতে হবে। যে সব সবজির চারা তৈরি হয়েছে সেগুলো মূল জমিতে রোপণ করতে হবে। সবজি ক্ষেতের আগাছা দমন, সেচ ও সার প্রয়োগ, কুমড়া জাতীয় সবজির পোকামাকড় ও রোগ বালাই দমন এর ব্যবস্থা নিতে হবে। নাবী রবি সবজি উঠানো, বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে হবে। মাটিতে রসের ঘাটতি হলে ফলের গুটি/কড়া ঝরে যায়। তাই প্রয়োজনীয় সেচ প্রদান, পোকামাকড় ও রোগবালাই দমন জরুরি। ( সংকলিত )

আবারও দাম বেড়েছে পেঁয়াজের

টানা ৫ মাস আলোচনা-সমালোচনার পর দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম কমতে শুরু করে। গত ১ মাসে ২৭০ টাকার দেশি পেঁয়াজের দাম নেমে আসে ১০০ টাকায়। অন্যদিকে আমদানি করা পেঁয়াজের দাম ২২০ টাকা থেকে নেমে আসে ৬০ টাকায় ও টিসিবির ট্রাক সেলের পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি ১০ টাকা কমে ৩৫ টাকায় চলে আসে।

কিন্তু দাম কমতে না কমতেই আবারও পেঁয়াজের দাম বাড়তে শুরু করেছে। বর্তমানে বাজারে আমদানি করা পেঁয়াজ না থাকায় কেজিপ্রতি ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে দেশি পেঁয়াজের দাম।

রাজধানীর রামপুরা, মালিবাগ, খিলগাঁও, মালিবাগ রেলগেট, মগবাজার, মতিঝিল টিঅ্যান্ডটি বাজার, ফকিরাপুল কাঁচা বাজার ও কারওয়ান বাজার ঘুরে এ চিত্র দেখা যায়।

এ সকল বাজারে এক সপ্তাহ আগে কেজিপ্রতি দেশি পেঁয়াজ ১০৫ থেকে ১১০ টাকায় ও আমদানি করা পেঁয়াজ কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। কিন্তু এখন দেশি পেঁয়াজের দাম বেড়ে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে। আর আমদানি করা পেঁয়াজ বাজারে তেমন নেই বললেই চলে। এখনো অল্প কিছু দোকানে যা আছে তা অপরিবর্তিত দামে বিক্রি হচ্ছে।

এ দিকে দীর্ঘদিন পর পেঁয়াজের দাম কমতে শুরু করায় ক্রেতাদের মধ্যে স্বস্তি আসছিল। কিন্তু হঠাৎ করে আবার দাম বেড়ে যাওয়ায় অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

কারওয়ান বাজারে এক ক্রেতা জানান, গত সপ্তাহে ১০৫ টাকা কেজি পেঁয়াজ কিনেছিলেন। হঠাৎ করেই আবার সেই পেঁয়াজের দাম ১৫০ টাকা হয়ে গেছে। এতোদিন যে সিন্ডিকেটের দখলে বাজার ছিল, তারাই আবার দাম বাড়িয়েছে বলে তিনি মনে করছেন। পেঁয়াজের দাম আবারও ক্রেতার সাধ্যের বাইরে চলে যাবে যদি এখনই সরকার হস্তক্ষেপ না করে।

অন্যদিকে বিক্রেতা বলেন, পাইকারি বাজারে দাম বাড়লে খুচরা বাজারেও দাম বাড়ে। যেহেতু এখন পাইকারি বাজার থেকে বেশি দামে পেঁয়াজ কিনতে হচ্ছে তাই তারাও পেঁয়াজের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে।

আবারো বাড়ছে পেঁয়াজের দাম

রাজধানীর বাজারে ফের বাড়ছে পিয়াজের দাম। গত দুই দিনে পিয়াজের দাম কেজিতে বেড়েছে ৪০ টাকা। ভারত রফতানি বন্ধ করার পর থেকে পিয়াজের দাম বাড়ছিল লাফিয়ে লাফিয়ে। কেজি ৪০-৫০ থেকে পিয়াজের দাম পৌঁছায় ২৫০ টাকায়।

যা সম্প্রতি কমে ১৮০-২০০ হয়েছিল। নিম্ন মানের পিয়াজ বিক্রি হয়েছিল ১২০-১৪০ কেজি দরে।

আবার বাড়তে শুরু করে পিয়াজের দাম।

গত শুক্রবার পিয়াজের দাম কেজিতে বাড়ে ২০ টাকা। শনিবারও কেজিতে পিয়াজের দাম বেড়েছে ২০ টাকা। এতে ভালো মানের পিয়াজের কেজি ২২০ এবং নিম্ন মানের পিয়াজের কেজি ১৭০ টাকায় পৌঁছেছে।

উল্লেখ্য, ভারত রফতানি বন্ধ করায় গত ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে দেশে পিয়াজের বাজার অস্থির হয়ে উঠে। দফায় দফায় বাড়তে থাকে পিয়াজের দাম।

অর্থনৈতিক মন্দার আশংকা বাংলাদেশে?

পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি ছাড়াও সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতি বেশ চাপের মুখে পড়েছে। জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও সংকট বাড়ছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ছাড়া অর্থনীতির সব সূচকই এখন নেতিবাচক ধারায় নেমে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, যেসব সূচক ঊর্ধ্বমুখী হলে অর্থনীতির গতি সঞ্চার হয়, সেই সূচকগুলো এখন নিম্নমুখী। আর যেসব সূচক নিম্নমুখী হলে অর্থনীতির ভিত শক্ত হয়, সেগুলো এখন ঊর্ধ্বমুখী। এমন পরিস্থিতিকে অর্থনৈতিক মন্দার সঙ্গে তুলনা করেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি মোটেও ভালো নয়। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়তে যাচ্ছে।

তিনি উল্লেখ করেন, ভারত ও চীনের অর্থনীতিও এখন নিম্নমুখী। ওই দুই দেশই অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে পড়ে গেছে। আমরাও মন্দায় পড়তে পারি। হয়তো পড়ে গেছি। রাজস্ব আদায় বাড়ছে না। বিনিয়োগ হচ্ছে না। কাঁচামালের আমদানি কমে গেছে। বেকারত্ব বাড়ছে।

ড. মনসুর বলেন, বাংলাদেশ মন্দায় পড়েছে এটা স্বীকার করলে এর থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে। তা না হলে দেশের অর্থনীতি আরও চাপের মুখে পড়বে। তিনি মনে করেন, মন্দা স্বীকার করে সেভাবে পলিসি নিলে এখান বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে। আর স্বীকার না করলে সেভাবে পলিসি নেওয়া সম্ভব হবে না। ফলে সংকট আরও বাড়তে পারে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, টানা কয়েক মাস ধরে রফতানি বাণিজ্যে ধস নেমেছে। রফতানির মতই আমদানি বাণিজ্যেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বেড়েই চলেছে বাণিজ্য ঘাটতি। বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। কমে গেছে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি। শুধু তাই নয়, কমে গেছে রাজস্ব আদায়ও। মূল্যস্ফীতি এখন উর্ধ্বমুখী। ব্যাংকের খেলাপি ঋণও বাড়ছে ভয়ঙ্করভাবে। পতন হতে হতে একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে দেশের পুঁজিবাজার।
অর্থনীতির অধিকাংশ সূচক নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকাকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক মন্দার দিকেই যাচ্ছে বলে মনে করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মন্দার ইঙ্গিত আমরা পাচ্ছি। এ কারণে আমাদের আগে থেকেই প্রস্তুতিও নিতে হবে। তার মতে,নিম্নমুখী বিভিন্ন সূচকগুলোর মধ্যে রফতানি যদি ঘুরে দাঁড়ায় তাহলে বিপদ কিছুটা কম হতে পারে। তবে সেটা খুবই অনিশ্চিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সারা বিশ্বেই এখন অর্থনৈতিক মন্দাভাব বিরাজ করছে। তবে বিশ্বমন্দার  প্রতিধ্বনির মধ্যেও বাংলাদেশ অপেক্ষাকৃত ভালো আছে। পাশের দেশ ভারত ও চীনের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে আমরা ভালো আছি। তিনি বলেন, বিশ্বমন্দা যেহেতু আসছে, সেহেতু আমাদের ভয় না পেয়ে মন্দা মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিয়ে থাকতে হবে। কীভাবে বিশ্বমন্দার প্রভাব থেকে দেশকে বাঁচাতে হবে সে ব্যাপারে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, ২০০৮ সালেও বিশ্বমন্দা এসেছিল। আমরা সেই সময় বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছিলাম। এ কারণে আমাদের কোনও ক্ষতি হয়নি। একইভাবে এখনও আগাম প্রস্তুতি নিয়ে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হলে আমরা এবারও মন্দার ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবো।
 

রফতানি খাত
কয়েক মাস ধরেই রফতানি আয় কমছে। সর্বশেষ অক্টোবর মাসে ৩০৭ কোটি ৩২ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি করেছে বাংলাদেশ, যা গত বছরের অক্টোবরের চেয়ে ১৭ দশমিক ১৯ শতাংশ কম। আর চলতি অর্থবছরের চার মাসের (জুলাই-অক্টোবর) হিসাবে রফতানি আয় কমেছে ৭ শতাংশের মতো। সুখবর নিয়েই অর্থবছরটা শুরু হলেও দ্বিতীয় মাস আগস্টে এসেই ধাক্কা খায় রফতানি আয়। আগস্ট মাসে গত বছরের আগস্টের চেয়ে সাড়ে ১১ শতাংশ আয় কমে আসে। সেপ্টেম্বরে কমে ৭ দশমিক ৩০ শতাংশ। সার্বিক পরিস্থিতিকে খুবই খারাপ বলে মন্তব্য করেছেন রফতানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক। তিনি বলেন, গেলো অক্টোবর মাসের ১ থেকে ২৮ অক্টোবর সময়ে গত বছরের একই সময়ের চেয়ে তৈরি পোশাক রফতানি কমেছে ২২ শতাংশ। অথচ গত বছরের এই ২৮ দিনে ৩৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল।
 

বাণিজ্য ঘাটতি
গত জুলাই মাসে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৯৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার। আগস্ট শেষে এটি বেড়ে দাঁড়ায় ১৯৯ কোটি ডলার। আর সেপ্টেম্বর শেষে এটি দাঁড়িয়েছে ৩৭১ কোটি ৭০ লাখ ডলারে।
 

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হতাশাজনক পর্যায়ে নেমে এসেছে। গত সেপ্টেম্বর মাস শেষে বার্ষিক ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান সরকারের দুই মেয়াদের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি। বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের আশানুরূপ ঋণ না পাওয়ার এই চিত্র ফুটে উঠেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, গত প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় ধরে অব্যাহতভাবে কমছে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণ। কমতে কমতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে, যা সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে চাপে ফেলছে। এদিকে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, ২০১৩ সালে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল। অথচ তখনকার চেয়েও এখন খারাপ সময় পার করছে বেসরকারি খাত। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ের (২০১৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত) কোনও একক মাসে এত কম প্রবৃদ্ধি ছিল না। এমনকি সর্বশেষ তত্ত্বাবধায়ক আমলেও (২০০৮) বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল এখনকার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রত্যেক মাসেই ঋণের প্রবৃদ্ধি কমছে। যেমন,  গত বছরের জানুয়ারির চেয়ে এই বছরের জানুয়ারিতে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক ২০ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে তা কমে দাঁড়ায় ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশে। মার্চে আরও কমে ১২ দশমিক ৪২ শতাংশে নামে। এপ্রিলে দাঁড়ায় ১২ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশে। এভাবে জুলাইয়ে আরও কমে দাঁড়ায় ১১ দশমিক ২৬ শতাংশে। আগস্টে কমে ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশে দাঁড়ায়। সর্বশেষ সেপ্টেম্বর শেষে বার্ষিক ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
 

লেনদেন ভারসাম্যে ফের ঘাটতি

রফতানি আয়ে বড় ধাক্কার কারণে ফের ঘাটতির মুখে পড়েছে বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্য-ব্যালান্স অফ পেমেন্ট। ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এই ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার। অথচ অগাস্ট মাস শেষেও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচক ২৬ কোটি ৮০ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত ছিল। নিয়মিত আমদানি-রফতানিসহ অন্যান্য আয়-ব্যয় চলতি হিসাবের অন্তর্ভুক্ত। এই হিসাব উদ্বৃত্ত থাকার অর্থ হলো, নিয়মিত লেনদেনে দেশকে কোনও ঋণ করতে হচ্ছে না। আর ঘাটতি থাকলে সরকারকে ঋণ নিয়ে তা পূরণ করতে হয়।
 

আমদানি

গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তার আগের বছরের চেয়ে আমদানি ব্যয় মাত্র ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ বেড়েছিল। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) তা ২ দশমিক ৫৫ শতাংশ ঋণাত্মক হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, এই তিন মাসে শিল্প স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনী যন্ত্রপাতি (ক্যাপিটাল মেশিনারি) আমদানি কমেছে ৮ শতাংশ। জ্বালানি তেল আমদানি কমেছে ১৪ শতাংশ। আর শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত সার্বিক আমদানির বাণিজ্য নিম্নমুখী ধারায় রয়েছে। গত জুন মাসে আমদানি বাণিজ্যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাইনাস ৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। এর আগের মাস মে মাসেও প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাইনাস ৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। গত এপ্রিল মাসে আমদানি বাণিজ্যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাইনাস ৬ দশমিক ১২ শতাংশ। এর আগে, মার্চে আমদানিতে প্রবৃদ্ধি মাত্র এক  শতাংশে আটকে ছিল। আর গত ফেব্রুয়ারিতে আমদানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাইনাস ৬ দশমিক ২৮ শতাংশ।
 

চাপে রিজার্ভ

প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয় কমার পরও চাপের মুখে পড়েছে বাংলাদেশের বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়—রিজার্ভ। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বৈদেশিক বাণিজ্যে স্থবিরতার কারণে কমে গেছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও। ৩০ সেপ্টেম্বরের তুলনায় আগের বছরের একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমেছে ৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ।  ২০১৭ সালের গত ২২ জুন অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে বাংলাদেশের রিজার্ভ ৩৩ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে। এরপর প্রতিবারই আকু’র বিল শোধের পর রিজার্ভ নেমে আসে। ৩৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়নি। গত ১৪ নভেম্বর রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
 

মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী

পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে অক্টোবরে মাসে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ, যা ২০১৮ সালের অক্টোবরে ছিল ৫ দশমিক ৪০ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়ার কারণে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। অক্টোবরে খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ হয়েছে, যা গত বছর অক্টোবরে ছিল ৫ দশমিক ০৮ শতাংশ। তবে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি বেশ কমেছে; ৫ দশমিক ৯০ শতাংশ থেকে ৫ দশমিক ৪৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
 

রাজস্ব আদায়

চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে গত বছরের একই সময়ের চেয়ে রাজস্ব আদায় বেড়েছে মাত্র ২ দশমিক ৬ শতাংশ। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আয় কম ১৭ শতাংশের মতো।  অর্থাৎ গত অর্থবছরের মতো চলতি অর্থবছরেও রাজস্ব আহরণে বড় ঘাটতির দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
 

পুঁজিবাজার

পুঁজিবাজারে মূল্যসূচক কমছেই। লেনদেন নেমে এসেছে তলানিতে। ২০১০ সালের ধসের পর নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাজার স্বাভাবিক হচ্ছে না। উল্টো দিন যত যাচ্ছে পরিস্থিতি ততই খারাপের দিকে যাচ্ছে।
 

ব্যাংক খাত

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে জুন পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ১১ দশমিক ৬৯ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরই একটি তথ্য বলছে, এখন পর্যন্ত ৬৭৫ জন ঋণগ্রহীতা আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে রেখেছেন। ফলে ঋণখেলাপি হিসেবে তাদের নাম বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরোতে (সিআইবি) উল্লেখ করা হয় না। এ রকম ঋণের পরিমাণ এখন ৭৯ হাজার ২৪২ কোটি টাকা।
 

রেমিট্যান্স

বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্য বলছে, বৈদেশিক বাণিজ্য নিম্নমুখী হলেও প্রবাসী আয় কিছুটা শক্ত অবস্থানে রয়েছে। এই বছরের সেপ্টেম্বরে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবাসী আয় বেড়েছে ২৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ। আর অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে প্রবাসী আয় বেড়েছে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ। সদ্য শেষ হওয়া অক্টোবর মাসে ১৬৪ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন তারা। এই অংক এক মাসের হিসাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। আর গত বছরের অক্টোবরের চেয়ে বেড়েছে ৩২ দশমিক ৩২ শতাংশ। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) ৬ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ২০ দশমিক ৪৮ শতাংশ বেশি।

পেঁয়াজ যেনো অপ্রতিরোধ্য, কেজি ২৫০টাকা

পেঁয়াজ যেন অপ্রতিরোধ্য। কেউ থামাতে পারবে না এর মূল্যের গতি। প্রতিদিনই যেন নতুন নতুন রেকর্ড গড়ার পথে পেঁয়াজ। সপ্তাহের ব্যবধানে তিন দফায় কেজিতে ১০০ টাকা বেড়ে এখন পেঁয়াজের দাম ২৫০ টাকায় পৌঁছেছে। এর মধ্যে শেষ তিন দিনেই বেড়েছে ৮০ টাকা। পেঁয়াজের এমন দাম বাড়ায় ক্রেতাদের পাশাপাশি খুচরা বিক্রেতারাও অবাক।

ভারত রফতানি বন্ধ করায় গত ২৯ সেপ্টেম্বর থেকেই দেশের পেঁয়াজের বাজার অস্থির। এরপর থেকে দফায় দফায় বাড়তে থাকে পেঁয়াজের দাম। পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করার সংবাদে ২৯ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো ১০০ টাকায় পৌঁছায় যায় দেশি পেঁয়াজের কেজি। খুচরা পর্যায়ে ভালো মানের দেশি পেঁয়াজ ১০০-১১০ টাকা কেজি বিক্রি হতে থাকে। এরপর বেশি কিছুদনি পেঁয়াজের দাম অনেকটাই স্থির ছিল। ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজিতে নেমে এসেছিল।

কিন্তু ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের পর আবারও পেঁয়াজের দাম বেড়ে যায়। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে এবং আমদানি করা পেঁয়াজ আসছে না- এমন অজুহাতে ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দেন, ফলে আবারও ১০০ টাকায় পৌঁছে যায় পেঁয়াজের কেজি।

এরপর বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি এক বক্তৃতায় বলেন, পেঁয়াজের কেজি ১০০ টাকার নিচে নামা সম্ভব নয়। মন্ত্রীর এই বক্তব্য পেঁয়াজের দাম বাড়ার বিষয়টিকে আরও উসকে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ১০০ টাকা থেকে পেঁয়াজের কেজি ১৩০ টাকায় পৌঁছে যায়। এ পরিস্থিতিতে শিল্পমন্ত্রী জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন, পেঁয়াজের দাম স্বাভাবিক আছে পরের দিন ওই পেঁয়াজের কেজি ১৫০ টাকায় পৌঁছে যায়।

তবে এখানেই থেমে থাকেনি পেঁয়াজের দাম বাড়ার প্রবণতা। বুধবার ১৫০ টাকা থেকে পেঁয়াজের দাম এক লাফে ১৭০ টাকা হয়। বৃহস্পতিবার সেই দাম আরও বেড়ে ২০০ টাকায় পৌঁছে যায়। আর সপ্তাহের শেষ দিন শুক্রবার তা আরও বেড়ে ২৫০ টাকায় পৌঁছেছে। এর আগে কখনো দেশের বাজারে এত দামে পেঁয়াজ বিক্রি হয়নি।

শুক্রবার ঢাকার সব থেকে বড় পাইকারি বাজার শ্যামবাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মিশর থেকে আসা পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২১০-২২০ টাকা কেজি। দেশি পেঁয়াজের কেজি বিক্রি হচ্ছে ২২০-২৩০ টাকা কেজি।

ব্যবসায়ী পরিচয় দিয়ে কথা বললে শ্যামবাজারের সোহেল স্টোরের মালিক বলেন, আজ পেঁয়াজের দাম অনেক বাড়তি। দেশি পেঁয়াজ শ্যামবাজারে ২৪০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে, আপনারাও দাম বাড়িয়ে বিক্রি করেন। মিসরের পেঁয়াজ এখানে ২২০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে।

পপুলার বাণিজ্যালয়ের বিক্রয়কর্মী মিরাজ বলেন, বাজারে পেঁয়াজ নাই। পেঁয়াজের ঘাটতির কারণে দফায় দফায় পেঁয়াজের দাম বাড়ছে। আজ পেঁয়াজের দাম কেজিতে বেড়েছে ৩০ টাকা। এ দাম কোথায় গিয়ে ঠেকে তার কোনো ঠিক নেই।

এদিকে রামপুরার বিভিন্ন বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, প্রতিকেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২৩০-২৫০ টাকা কেজিতে। পেঁয়াজের দামের বিষয়ে রামপুরার ব্যবসায়ী মিলন বলেন, প্রতিদিনই পেঁয়াজের দাম বাড়ছে। আমাদের করার কিছু নেই। বুধবার শ্যামবাজার থেকে ১৬০ টাকা কেজি পেঁয়াজ কিনেছি। গতকাল পেঁয়াজ কিনতে হয়েছে ২০০ টাকায়। আর আজ শ্যামবাজারে পেঁয়াজ ২৩০ টাকা কেজি।

এই ব্যবসায়ী বলেন, শ্যামবাজারের ব্যবসায়ীদের কারণেই পেঁয়াজের দাম বাড়ছে। আর মন্ত্রীদের বক্তব্য পেঁয়াজের দাম বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। মন্ত্রীরা উল্টো-পাল্টা বক্তব্য না দিলে কিছুতেই পেঁয়াজের কেজি ২০০ টাকা হয় না।

শান্তিনগর বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজের কেজি ২৩০ থেকে ২৪০ টাকা বিক্রি করছেন। বাজারটির ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন পণ্যের মূল্য তালিকা ঝুলিয়ে রাখলেও পেঁয়াজের ঘর খালি রেখেছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভাই ভাই স্টোরের ইমরান বলেন, যে মূল্য তালিকা রয়েছে তা গতকালের। আজ পেঁয়াজের দাম একটু বাড়তি। গতকালের তুলনায় আজ পেঁয়াজের দাম কেজিতে ৩০ টাকা বেড়েছে। গতকাল যে পেঁয়াজ ২০০ টাকা কেজি বিক্রি করেছি তা আজ ২৩০ টাকা কেজি বিক্রি করতে হচ্ছে।

নিউমার্কেটে বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, ব্যবসায়ীরা প্রতি কেজি পেঁয়াজ ২৩০ থেকে ২৪০ টাকা দামে বিক্রি করছেন। এ বাজারটিতেও পেঁয়াজের মূল্য তালিকা দেখা যায়নি।

বাজারের ব্যবসায়ী কাউসার বলেন, প্রতিদিনই পেঁয়াজের দাম বাড়ছে। গতকাল যে পেঁয়াজ ২০০ টাকা কেজি ছিল, আজ তা ২৪০ টাকা হয়েছে। পেঁয়াজের এমন দাম বাড়ায় আমরাও হতবাক। দেশে কখনো পেঁয়াজের এমন দাম হয়নি। কিন্তু আমাদের কিছু করার নেই। পাইকারিতে দাম না কমলে আমরা কম দামে বিক্রি করতে পারছি না।

অনিয়ন্ত্রিত পেঁয়াজের বাজার, কেজি প্রতি দাম ১৯০ থেকে ২০০ টাকা

কোনভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না পেঁয়াজের বাজার। কাজে আসেনি কোন পদক্ষেপ। দেশি পেঁয়াজের দাম আজ কেজি প্রতি ১৯০ থেকে ২০০ টাকা।

রাজধানীতে আজ মিশর থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৪০থেকে ১৫০ টাকা, মিয়ানমারের পেঁয়াজ ১৭০ থেকে ১৮০ আর দেশী পেঁয়াজের দাম ১৯০ থেকে ২শ’ টাকা।

পেঁয়াজের এমন লাগামহীন দামে ক্ষোভ ক্রেতাদের মাঝে। পেঁয়াজের বাজার কারা নিয়ন্ত্রণ করছেন সে প্রশ্ন সাধারণ মানুষের। মিয়ানমার থেকে ৪২ টাকা দরে পেঁয়াজ কেনার পরেও দেশে কোন অজুহাতে এত দাম সে প্রশ্নও ক্রেতাদের। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান তাদের।

আর বিক্রেতাদের দাবি তাদের বেশি দামে কিনতে হয় বলেই বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।

এদিকে, চট্টগ্রামে খাতুনগঞ্জ পাইকারি বাজারে মিয়ানমারের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৭০ টাকায়। গতকালের চেয়ে যা ২০ টাকা বেশি।